Bird Care

বাজিগার পাখিকে দ্রুত পোষ মানানোর সহজ কৌশল

বাজিগার পাখি পোষ মানানোর সহজ উপায়

বাজিগার পাখিকে পোষ মানানো ধৈর্য ও ভালোবাসার মাধ্যমে সহজেই সম্ভব। সঠিকভাবে পরিচিত করানো, হাতে খাবার দেওয়া এবং নিয়মিত সময় দেওয়ার মাধ্যমে পাখির সঙ্গে সুন্দর বন্ধন তৈরি করা যায়।

তবে চিন্তার কিছু নেই। ধৈর্য ধরে সঠিক নিয়ম অনুসরণ করলে পাখিটি ধীরে ধীরে আপনার সঙ্গে পরিচিত হবে। প্রথমে তার ভয় কমাতে হবে। এরপর খাবার ও কথার মাধ্যমে বন্ধুত্ব তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, প্রতিদিন অল্প সময় প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

এই লেখায় আমরা জানব, কীভাবে সহজ উপায়ে বাজিগারকে মানুষের সঙ্গে অভ্যস্ত করা যায়।

নতুন পাখিকে সময় দিন

নতুন পাখি বাড়িতে এলে প্রথম কয়েকদিন তাকে শান্তিতে থাকতে দিন। কারণ নতুন খাঁচা এবং নতুন পরিবেশ তার কাছে অপরিচিত।

প্রথমত, খাঁচাটি শান্ত জায়গায় রাখুন। তবে এমন জায়গা বেছে নিন, যেখানে পরিবারের সদস্যদের দেখা যায়। এতে পাখিটি একা মনে করবে না।

এছাড়া, খাঁচাটি বারবার স্থান পরিবর্তন করবেন না। একই জায়গায় রাখলে পাখি দ্রুত পরিবেশ চিনতে পারে।

প্রথম কয়েকদিন তাকে ধরার চেষ্টা না করাই ভালো। বরং দূর থেকে তার আচরণ লক্ষ্য করুন। সে খাবার খাচ্ছে কি না দেখুন। একই সঙ্গে পানি পান করছে কি না সেটিও খেয়াল করুন।

শান্তভাবে পাখির সঙ্গে কথা বলুন

পাখির সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য কথা বলা খুব কার্যকর। তাই প্রতিদিন কিছু সময় তার সঙ্গে কথা বলুন।

খাঁচার পাশে বসে নরম স্বরে কথা বলুন। তার নাম থাকলে নাম ধরে ডাকতে পারেন। এভাবে, পাখিটি আপনার কণ্ঠস্বর চিনতে শুরু করবে।

তবে জোরে কথা বলা বা চিৎকার করা উচিত নয়। কারণ হঠাৎ শব্দে পাখি ভয় পেতে পারে।

অন্যদিকে, শান্ত কণ্ঠস্বর পাখিকে নিরাপদ অনুভব করতে সাহায্য করে। ফলে ধীরে ধীরে আপনার উপস্থিতিতে তার ভয় কমতে পারে।

বাজিগার পাখিকে পোষ মানানো – র প্রথম ধাপ

বাজিগার পাখিকে পোষ মানানো

পাখিকে ধীরে ধীরে হাতে ওঠার প্রশিক্ষণ দিতে হয়। প্রশিক্ষণের সময় শান্ত থাকা, জোর না করা এবং সঠিক আচরণের জন্য পুরস্কার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পাখির প্রশিক্ষণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে RSPCA-এর Bird Training Guide দেখতে পারেন।

অনেক নতুন বাজিগার মানুষের হাতকে ভয় পায়। তাই হঠাৎ হাত খাঁচার ভেতরে ঢোকাবেন না।

প্রথমে খাঁচার বাইরে থেকে হাত দেখান। কিছুক্ষণ হাত স্থির রাখুন। পাখি যদি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে পরের ধাপে যেতে পারেন।

এরপর, ধীরে ধীরে খাঁচার কাছে হাত নিন। তবে পাখিকে ধরার চেষ্টা করবেন না।

যদি পাখি পিছিয়ে যায়, তাহলে হাত সরিয়ে নিন। পরে আবার চেষ্টা করুন। এই নিয়ম মেনে চললে পাখি বুঝতে পারবে যে আপনার হাত তার জন্য বিপজ্জনক নয়।

খাবারের মাধ্যমে বন্ধুত্ব তৈরি করুন

খাবার ব্যবহার করেও পাখির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করা যায়। তাই, তার পছন্দের নিরাপদ খাবার হাতে নিয়ে খাঁচার কাছে বসুন।

প্রথমদিকে পাখি আপনার হাত থেকে খাবার নাও নিতে পারে। এটি স্বাভাবিক। তবে হতাশ হওয়ার দরকার নেই।

প্রতিদিন কিছু সময় চেষ্টা করুন। ধীরে ধীরে, পাখিটি আপনার হাতের কাছে আসতে পারে।

যখন সে আপনার হাত থেকে খাবার নেবে, তখন তাকে শান্তভাবে প্রশংসা করুন। ফলে, পাখির মনে আপনার সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি হতে পারে।

আঙুলে বসার প্রশিক্ষণ দিন

পাখি যখন আপনার হাতকে ভয় পাবে না, তখন আঙুলে বসার প্রশিক্ষণ শুরু করতে পারেন।

প্রথমে তর্জনী আঙুলটি পাখির পায়ের সামনে রাখুন। তারপর নরমভাবে তাকে আঙুলে উঠতে উৎসাহ দিন।

প্রয়োজনে সামনে সামান্য নিরাপদ খাবার রাখতে পারেন। এর ফলে, খাবারের জন্য পাখিটি আপনার আঙুলের কাছে আসতে পারে।

সে যদি আঙুলে উঠে আসে, তাহলে হঠাৎ হাত নাড়াবেন না। বরং কিছুক্ষণ স্থির থাকুন। এরপর তাকে ধীরে ধীরে খাঁচায় ফিরিয়ে দিন।

প্রতিদিন অল্প সময় এই অনুশীলন করলে পাখিটি আপনার আঙুলে বসতে অভ্যস্ত হতে পারে।

জোর করে পাখিকে ধরবেন না

বাজিগার পোষ মানানোর সময় এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম।

পাখি যদি আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে তার পেছনে হাত নিয়ে যাবেন না। কারণ, এতে সে আরও ভয় পেতে পারে।

একইভাবে খাঁচার কোণায় তাকে আটকে ধরার চেষ্টা করবেন না। বরং, তাকে নিজের মতো করে আপনার কাছে আসার সুযোগ দিন।

অন্যথায়, পাখির মনে মানুষের হাত সম্পর্কে ভয় তৈরি হতে পারে। ফলে পরবর্তী প্রশিক্ষণ আরও কঠিন হয়ে যাবে।

প্রতিদিন অল্প সময় প্রশিক্ষণ দিন

একদিন অনেকক্ষণ প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং, প্রতিদিন অল্প সময় অনুশীলন করুন।

সকালে কয়েক মিনিট পাখির সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এরপর, বিকেলে হাতে খাবার নিয়ে তাকে কাছে আসতে উৎসাহ দিন।

পাখি যদি শান্ত থাকে, তাহলে আঙুলে বসার অনুশীলন করুন। তবে, সে অস্থির হয়ে গেলে প্রশিক্ষণ বন্ধ করুন।

পরের দিন আবার নতুন করে শুরু করুন। এভাবে নিয়মিত অনুশীলন করলে পাখিটি ধীরে ধীরে আপনার সঙ্গে অভ্যস্ত হবে।

পাখির আচরণ বুঝুন

বাজিগার কথা বলতে না পারলেও তার আচরণের মাধ্যমে অনেক কিছু বোঝা যায়।

যদি পাখি আপনার সামনে শান্ত থাকে, তাহলে বুঝতে পারবেন সে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। এছাড়া, সে আপনার সামনে খাবার খেলেও ভালো লক্ষণ।

অন্যদিকে, পাখি যদি বারবার পালানোর চেষ্টা করে, তাহলে তাকে আরও সময় দিতে হবে।

সে যদি ভয়ে খাঁচার এক পাশে চলে যায়, তখন হাত বাড়াবেন না। বরং, কিছুটা দূরে সরে যান।

এভাবে পাখির আচরণ বুঝে প্রশিক্ষণের গতি ঠিক করতে পারবেন।

ভালো আচরণের জন্য পুরস্কার দিন

পাখি আপনার হাত থেকে খাবার নিলে তাকে অল্প পরিমাণে নিরাপদ খাবার দিতে পারেন। একইভাবে সে আঙুলে বসলে শান্তভাবে প্রশংসা করুন।

এরপর, ধীরে ধীরে একই প্রশিক্ষণ আবার করুন। এতে পাখি বুঝতে পারে যে ভালো আচরণের জন্য সে পুরস্কার পায়।

তবে, অতিরিক্ত খাবার দিয়ে পুরস্কার দেওয়া উচিত নয়। কারণ বেশি খাবার দিলে তার স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে সমস্যা হতে পারে।

খাঁচার পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন

শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না। পাখির থাকার জায়গাও আরামদায়ক হওয়া দরকার।

প্রথমত, প্রতিদিন পরিষ্কার পানি দিন। এছাড়া, খাবারের পাত্র পরিষ্কার রাখুন।

খাঁচার নিচের অংশেও ময়লা জমতে দেবেন না। কারণ, অপরিষ্কার পরিবেশ পাখির জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।

পাশাপাশি, কয়েকটি নিরাপদ খেলনা রাখতে পারেন। তবে খাঁচায় বেশি খেলনা রাখবেন না। এতে পাখির চলাফেরার জায়গা কমে যেতে পারে।

নিরাপদে খাঁচার বাইরে আনুন

পাখি যখন আপনার হাতে শান্তভাবে বসতে শুরু করবে, তখন তাকে ঘরের ভেতর অল্প সময়ের জন্য বের করতে পারেন।

তবে এর আগে ঘরটি নিরাপদ করুন। প্রথমে জানালা ও দরজা বন্ধ করুন। এরপর সিলিং ফ্যান বন্ধ করুন।

এছাড়া রান্নাঘর, আগুন এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা থেকে পাখিকে দূরে রাখুন।

ফলে, পাখি বাইরে থাকলেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কম থাকবে।

খেলাধুলার সুযোগ দিন

বাজিগার খুব সক্রিয় পাখি। তাই তাকে খেলাধুলার সুযোগ দেওয়া দরকার।

খাঁচায় নিরাপদ খেলনা এবং বসার কাঠি রাখতে পারেন। এছাড়া, প্রতিদিন কিছু সময় তার সঙ্গে কথা বলুন।

তবে, খেলনা কেনার সময় সতর্ক থাকুন। ধারালো অংশ বা সহজে ছিঁড়ে যায় এমন জিনিস এড়িয়ে চলুন।

পাশাপাশি, খেলনাগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করুন। নষ্ট হয়ে গেলে সেটি পরিবর্তন করুন।

প্রতিদিন একই রুটিন রাখুন

পাখিকে মানুষের সঙ্গে অভ্যস্ত করার ক্ষেত্রে নিয়মিত রুটিন বেশ কার্যকর। তাই, প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে খাবার দিন।

একইভাবে নির্দিষ্ট সময়ে তার সঙ্গে কথা বলুন। এরপর, কয়েক মিনিট প্রশিক্ষণ দিন।

একদিন অনেক সময় দিয়ে পরের কয়েকদিন একেবারেই সময় না দেওয়া ঠিক নয়। বরং, প্রতিদিন অল্প সময় দিলেও নিয়মিত দিন।

ফলে, পাখিটি আপনার দৈনন্দিন উপস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠবে।

একাধিক বাজিগার থাকলে কী করবেন?

অনেকেই একসঙ্গে দুই বা তার বেশি বাজিগার পালন করেন। এতে পাখিরা নিজেদের মধ্যে বেশি সময় কাটাতে পারে।

তাই, মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি করতে কিছুটা বেশি সময় লাগতে পারে। তবে ধৈর্য ধরলে সমস্যা হয় না।

প্রতিটি পাখির সঙ্গে আলাদাভাবে কিছু সময় কাটান। হাতে খাবার দিন এবং শান্তভাবে কথা বলুন।

এভাবে, ধীরে ধীরে প্রতিটি পাখির সঙ্গে আলাদা সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব।

বাজিগারকে পোষ মানাতে কতদিন লাগে?

এর নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। কারণ প্রতিটি পাখির স্বভাব আলাদা।

কোনো পাখি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হাতে আসতে পারে। অন্যদিকে, কোনো পাখির আরও বেশি সময় লাগতে পারে।

তাই দ্রুত ফল পাওয়ার জন্য কখনো জোর করবেন না। বরং, প্রতিদিন একটু একটু করে অনুশীলন করুন।

অবশেষে, পাখিটি আপনার ওপর বিশ্বাস করতে শুরু করবে। তখন সে আপনার হাতের কাছে আসতে এবং আঙুলে বসতে আগ্রহ দেখাতে পারে।

যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন

বাজিগার পোষ মানানোর সময় কিছু সাধারণ ভুল এড়ানো দরকার।

প্রথমত, জোর করে পাখিকে ধরবেন না। দ্বিতীয়ত, খাঁচায় আঘাত করবেন না। তৃতীয়ত, জোরে শব্দ করে তাকে ভয় দেখাবেন না।

এছাড়া, পাখি আপনার কথা না শুনলে রাগ করবেন না। কারণ প্রতিটি পাখি একই গতিতে শেখে না।

বরং, তার আচরণ বুঝুন এবং প্রয়োজনে কিছুদিন সময় দিন। তারপর আবার প্রশিক্ষণ শুরু করুন।

বাজিগার পাখিকে পোষ মানানোর সহজ উপায়

সকাল: পরিষ্কার পানি ও খাবার দিন। এরপর কয়েক মিনিট শান্তভাবে কথা বলুন।

দুপুর: খাঁচার কাছে কিছু সময় বসুন। পাখিকে আপনার উপস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হতে দিন।

বিকেল: হাতে নিরাপদ খাবার নিয়ে তাকে কাছে আসতে উৎসাহ দিন।

সন্ধ্যা: কয়েক মিনিট আঙুলে বসার অনুশীলন করুন।

তবে, পাখি ভয় পেলে সেদিনের প্রশিক্ষণ বন্ধ করুন। পরের দিন আবার ধীরে ধীরে শুরু করুন।

পোষ মানানোর পরও যত্ন নিন

পাখি আপনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার পরও নিয়মিত যত্ন চালিয়ে যেতে হবে। তাই, প্রতিদিন তার খাবার, পানি এবং খাঁচার পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিন।

এছাড়া, কিছু সময় পাখির সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। এতে আপনাদের সম্পর্ক আরও ভালো হবে।

পাখি হঠাৎ খাবার বন্ধ করলে বা অস্বাভাবিক আচরণ করলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুন। প্রয়োজনে, অভিজ্ঞ ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ নিন।

উপসংহার

বাজিগার পাখিকে পোষ মানানো কঠিন কোনো কাজ নয়। তবে এর জন্য ধৈর্য, ভালোবাসা এবং নিয়মিত অনুশীলন দরকার।

প্রথমে, পাখিকে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে দিন। এরপর, শান্তভাবে কথা বলুন এবং খাবারের মাধ্যমে বিশ্বাস তৈরি করুন। পাশাপাশি, ধীরে ধীরে হাত ও আঙুলের সঙ্গে পরিচিত করুন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাখিকে কখনো জোর করবেন না। বরং, তার আচরণ বুঝে ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণ দিন।

সুতরাং, আপনার বাজিগার প্রথমদিকে কাছে না এলেও হতাশ হবেন না। সময় দিন এবং প্রতিদিন অল্প করে অনুশীলন করুন। এভাবে, একসময় আপনার ছোট্ট পাখিটি আপনার হাতের কাছে আসবে এবং আপনাকে নিজের পরিচিত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *