বিড়ালের লোম পড়া কমানোর ১০টি কার্যকর উপায়
বিড়ালের লোম পড়া কমানোর ১০টি কার্যকর উপায়
বিড়াল পোষা মানুষের জন্য বেশ আনন্দের। নরম লোম আর সুন্দর চেহারা সবাইকে আকর্ষণ করে। বিড়ালের লোম পড়া কমানোর সঠিক উপায় জানা প্রতিটি বিড়ালপ্রেমীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
, সোফা, কাপড় ও কার্পেটে লোম জমে যায়। ফলে ঘর পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিছু লোম পড়া অবশ্য স্বাভাবিক। পুরোনো লোম ঝরে যায়। এরপর নতুন লোম গজায়। ঋতু পরিবর্তনের সময়ও লোম কিছুটা বেশি পড়তে পারে। তাই অল্প লোম পড়লে চিন্তার কারণ নেই।
তবে হঠাৎ করে অনেক বেশি লোম পড়লে বিষয়টি দেখা দরকার। খাবারের সমস্যা, ফ্লি, ত্বকের সমস্যা বা দুশ্চিন্তার কারণে এমন হতে পারে। তাই শুধু লোম পরিষ্কার করলেই হবে না। বিড়ালের শরীরের যত্নও নিতে হবে।
এই লেখায় বিড়ালের লোম পড়া কমানোর ১০টি সহজ উপায় তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো নিয়মিত মেনে চললে অতিরিক্ত লোম ঝরা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
১. বিড়ালের পশম ঝরা রোধ করার সহজ উপায়
বিড়ালের লোমের যত্নে ব্রাশ খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্রাশ করলে শরীরের আলগা লোম উঠে আসে। ফলে সেই লোম ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে না।
লম্বা লোমের বিড়াল হলে প্রতিদিন ব্রাশ করা ভালো। অন্যদিকে, ছোট লোমের বিড়ালকে সপ্তাহে কয়েকবার ব্রাশ করা যায়।
তবে ব্রাশ করার সময় ধীরে কাজ করতে হবে। খুব জোরে ব্রাশ করা ঠিক নয়। এতে ত্বকে ব্যথা হতে পারে।
প্রথমে অল্প সময় ব্রাশ করুন। এরপর ধীরে ধীরে সময় বাড়ান। এতে বিড়াল সহজেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে।
এছাড়া ব্রাশ করলে লোমের জট কমে। মৃত লোমও সহজে উঠে যায়। পাশাপাশি ত্বকের অবস্থাও দেখা যায়।
বিশেষ করে লম্বা লোমের বিড়ালের ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্রাশ বেশ উপকারী। তাই এটিকে প্রতিদিনের যত্নের অংশ বানান।
২. বিড়ালের লোম পড়া কমানোর জন্য
ভালো ও পুষ্টিকর খাবার দিন

বিড়ালের লোম ভালো রাখতে খাবারের ভূমিকা অনেক। শরীরের ভেতর থেকে সঠিক পুষ্টি পেলে ত্বক ও লোম ভালো থাকে।
তাই বিড়ালের বয়স অনুযায়ী ভালো খাবার দিন। খাবারে প্রোটিন থাকা দরকার। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজও থাকা ভালো।
ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বক ও লোমের জন্য উপকারী হতে পারে। তাই এসব উপাদান থাকা মানসম্মত খাবার বেছে নিতে পারেন।
তবে নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট দেবেন না। কারণ প্রতিটি বিড়ালের চাহিদা এক নয়। প্রয়োজনে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অন্যদিকে, নিম্নমানের খাবার নিয়মিত দিলে পুষ্টির অভাব হতে পারে। ফলে লোম দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া হঠাৎ করে খাবার পরিবর্তন করবেন না। নতুন খাবার দিতে হলে ধীরে ধীরে অভ্যাস করানো ভালো।
৩. বিড়ালের লোম ঝরা রোধ করতে পানির প্রয়োজনীয়তা
খাবারের পাশাপাশি পানির দিকেও নজর দিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতাও বজায় থাকে।
তাই বিড়ালের সামনে সব সময় পরিষ্কার পানি রাখুন। পানির বাটি প্রতিদিন ধুয়ে দিন। নোংরা পানি অনেক বিড়াল খেতে চায় না।
কিছু বিড়াল বাটির পানি কম পান করে। এমন হলে অন্য ধরনের পাত্র ব্যবহার করে দেখতে পারেন। আবার কিছু বিড়াল চলমান পানি বেশি পছন্দ করে।
এছাড়া ভেজা খাবার থেকেও কিছু পানি পাওয়া যায়। তবে খাবারে পরিবর্তন আনার আগে বিড়ালের বয়স ও স্বাস্থ্য বিবেচনা করুন।
পরিষ্কার পানি সহজেই পাওয়া গেলে বিড়াল নিয়মিত পানি পান করতে পারে। ফলে শরীরও ভালো থাকে।
৪. বিড়ালের লোম ঝরা কমাতে ত্বক ও লোম পরিষ্কার রাখুন
সুস্থ ত্বক থাকলে লোমও ভালো থাকে। তাই শুধু লোম নয়, ত্বকের দিকেও নজর দিতে হবে।
ব্রাশ করার সময় ত্বক দেখে নিন। কোথাও লাল দাগ আছে কি না লক্ষ্য করুন। খুশকি বা ক্ষত আছে কি না তাও দেখুন।
কারণ ত্বকে সমস্যা হলে বিড়াল বেশি চুলকাতে পারে। ফলে লোম পড়ার পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
তবে বিড়ালকে বারবার গোসল করানোর দরকার নেই। অতিরিক্ত গোসল ত্বক শুষ্ক করে দিতে পারে।
প্রয়োজন হলে বিড়ালের জন্য তৈরি শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। মানুষের শ্যাম্পু ব্যবহার করবেন না। কারণ মানুষের শ্যাম্পু বিড়ালের ত্বকের জন্য উপযুক্ত নয়।
এছাড়া গোসলের পর লোম ভালোভাবে শুকিয়ে দিন। ভেজা লোম রেখে দেওয়া ঠিক নয়।
৫. ফ্লি থেকে বিড়ালকে সুরক্ষিত রাখুন
ফ্লি বিড়ালের ত্বকের জন্য বেশ বিরক্তিকর। এগুলো থাকলে বিড়াল বারবার শরীর চুলকাতে পারে।
ফলে লোম বেশি পড়তে পারে। আবার কিছু বিড়াল অতিরিক্ত লোম চেটে পরিষ্কার করে। এর কারণেও লোম পাতলা হতে পারে।
তাই নিয়মিত বিড়ালের শরীর পরীক্ষা করুন। বিশেষ করে ঘাড়, পিঠ ও লেজের গোড়া দেখুন।
ফ্লি দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তবে নিজের ইচ্ছায় যেকোনো ওষুধ ব্যবহার করবেন না।
কারণ সব ফ্লি পণ্য বিড়ালের জন্য নিরাপদ নয়। তাই পণ্য ব্যবহারের আগে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
পাশাপাশি বিড়ালের বিছানা ও থাকার জায়গাও পরিষ্কার রাখুন। এতে ফ্লি ছড়ানোর ঝুঁকি কমে।
৬. বিড়ালের দুশ্চিন্তা কমান
বিড়ালের লোম পড়ার পেছনে মানসিক চাপও কাজ করতে পারে। বাড়ির পরিবেশ বদলে গেলে কিছু বিড়াল অস্বস্তি বোধ করে।
নতুন মানুষ আসা, নতুন পোষা প্রাণী আনা বা বেশি শব্দ হওয়ার কারণে এমন হতে পারে।
কিছু বিড়াল তখন বারবার শরীর চাটতে থাকে। ফলে নির্দিষ্ট জায়গার লোম পাতলা হয়ে যেতে পারে।
তাই বিড়ালের জন্য শান্ত একটি জায়গা রাখুন। সেখানে সে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে।
এছাড়া প্রতিদিন কিছু সময় তার সঙ্গে কাটান। আদর করুন এবং খেলুন। এতে তার মন ভালো থাকবে।
হঠাৎ করে পরিবেশে বড় পরিবর্তন না করাই ভালো। পরিবর্তন দরকার হলে ধীরে ধীরে করুন।
ফলে বিড়াল নতুন পরিবেশের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারবে।
৭.বিড়ালের লোম ঝরা কমাতে
প্রতিদিন খেলাধুলার ব্যবস্থা করুন
বিড়ালের শরীর ও মন ভালো রাখতে খেলাধুলা দরকার। তাই প্রতিদিন কিছু সময় তাকে খেলতে দিন।
বল, খেলনা ইঁদুর বা ফেদার টয় ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া নিরাপদ ইন্টার্যাক্টিভ খেলনাও দিতে পারেন।
নিয়মিত খেলাধুলা করলে বিড়াল সক্রিয় থাকে। পাশাপাশি একঘেয়েমি কমে।
অনেক সময় একাকীত্ব থেকেও বিড়াল দুশ্চিন্তায় পড়ে। তাই তার সঙ্গে সময় কাটানো গুরুত্বপূর্ণ।
তবে খেলনা বেছে নেওয়ার সময় সতর্ক থাকুন। ছোট অংশ সহজে খুলে যায় এমন খেলনা ব্যবহার করবেন না।
খেলার সময় বিড়ালের আচরণ লক্ষ্য করুন। সে আনন্দের সঙ্গে খেলছে কি না দেখুন।
এভাবে খেলাধুলা ও আদরের মাধ্যমে বিড়ালের মানসিক চাপ কমাতে পারেন।
৮. বিড়ালের থাকার জায়গা পরিষ্কার রাখুন
লোম পড়া পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই ঘর পরিষ্কার রাখার অভ্যাসও করতে হবে।
বিড়াল যেখানে বেশি বসে, সেই জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার করুন। সোফা, বিছানা ও কার্পেটে বিশেষ নজর দিন।
বিড়ালের জন্য আলাদা একটি কম্বল ব্যবহার করতে পারেন। এতে লোম একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বেশি জমবে।
ফলে ঘর পরিষ্কার করা সহজ হবে। পাশাপাশি বিড়ালের নিজের জায়গাটিও পরিষ্কার থাকবে।
এছাড়া খাবারের বাটি ও পানির বাটিও প্রতিদিন পরিষ্কার করুন। বিড়ালের বিছানা নিয়মিত ধুয়ে দিন।
অন্যদিকে, ঘরে ধুলো বেশি জমতে দেবেন না। পরিষ্কার পরিবেশ বিড়ালের জন্যও আরামদায়ক।
৯. বিড়ালের স্বাস্থ্য নিয়মিত দেখুন
অনেক সময় অতিরিক্ত লোম পড়ার পেছনে শরীরের সমস্যা থাকতে পারে। তাই হঠাৎ লোম পড়া বেড়ে গেলে সতর্ক হন।
বিড়ালের ত্বকে লাল দাগ আছে কি না দেখুন। চুলকানি বা ক্ষত আছে কি না লক্ষ্য করুন।
এছাড়া শরীরের কোনো অংশে গোল হয়ে লোম উঠে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিন।
কারণ শুধু ব্রাশ করলে সব ধরনের লোম পড়ার সমস্যা ঠিক নাও হতে পারে। প্রথমে কারণ জানা দরকার।
তাই অস্বাভাবিক কিছু দেখলে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে লোম পড়ার সঙ্গে অন্য সমস্যা থাকলে দেরি করবেন না।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে অনেক সমস্যা দ্রুত ধরা পড়ে। ফলে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।
১০. বিড়ালের লোম পড়া কমাতে ভুল প্রথা বর্জন করুন
বিড়ালের লোম সুন্দর রাখতে অনেকে নানা পণ্য ব্যবহার করেন। তবে সব পণ্য বিড়ালের জন্য নিরাপদ নয়।
মানুষের শ্যাম্পু বিড়ালের শরীরে ব্যবহার করবেন না। এতে ত্বক শুষ্ক বা সংবেদনশীল হতে পারে।
একইভাবে খুব শক্ত ব্রাশ ব্যবহার করাও ঠিক নয়। এতে ত্বকে জ্বালা হতে পারে।
তাই বিড়ালের লোম অনুযায়ী সঠিক ব্রাশ বেছে নিন। পাশাপাশি বিড়ালের জন্য তৈরি নিরাপদ পণ্য ব্যবহার করুন।
প্রয়োজনে পশুচিকিৎসক বা অভিজ্ঞ গ্রুমারের পরামর্শ নিন। এতে ভুল পণ্য ব্যবহারের ঝুঁকি কমবে।
এছাড়া অতিরিক্ত গোসল করাবেন না। পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি ত্বকের স্বাভাবিক তেলও বজায় রাখতে হবে।
বিড়ালের লোম পড়া কখন স্বাভাবিক?
প্রতিদিন কিছু লোম পড়া স্বাভাবিক। কারণ পুরোনো লোম ঝরে গিয়ে নতুন লোম গজায়।
ঋতু পরিবর্তনের সময় লোম কিছুটা বেশি পড়তে পারে। তাই অল্প লোম পড়লে সাধারণত চিন্তার কারণ নেই।
তবে হঠাৎ করে লোম পড়া অনেক বেড়ে গেলে বিষয়টি লক্ষ্য করুন। পাশাপাশি ত্বকের অবস্থাও দেখুন।
যদি বিড়াল স্বাভাবিকভাবে খায়, খেলে এবং ঘুমায়, তাহলে সাধারণ যত্ন চালিয়ে যেতে পারেন।
অন্যদিকে, চুলকানি, ক্ষত বা টাকের মতো দাগ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।
অতিরিক্ত লোম ঝরা কমাতে কী করবেন?
প্রথমে নিয়মিত ব্রাশ করার অভ্যাস তৈরি করুন। এরপর খাবারের মানের দিকে নজর দিন। পাশাপাশি পরিষ্কার পানি নিশ্চিত করুন।
এছাড়া ফ্লি আছে কি না দেখুন। বিড়ালের থাকার জায়গাও পরিষ্কার রাখুন।
প্রতিদিন কিছু সময় বিড়ালের সঙ্গে খেলুন। এতে তার শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকবে।
তবে লোম পড়া হঠাৎ বেড়ে গেলে শুধু ঘর পরিষ্কার করবেন না। কারণ এর পেছনে স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকতে পারে।
তাই বিড়ালের লোম, ত্বক ও আচরণ নিয়মিত লক্ষ্য করুন। কোনো পরিবর্তন দেখলে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।
বিড়ালের লোমের যত্নে যেসব ভুল এড়াবেন
বিড়ালকে বারবার গোসল করানো একটি সাধারণ ভুল। এতে ত্বক শুষ্ক হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী গোসল করান।
আরেকটি ভুল হলো মানুষের শ্যাম্পু ব্যবহার করা। এটি বিড়ালের ত্বকের জন্য উপযুক্ত নয়।
অনেকে আবার খুব জোরে ব্রাশ করেন। এতে বিড়াল ব্যথা পেতে পারে। তাই ধীরে ও যত্নের সঙ্গে ব্রাশ করুন।
এছাড়া শুধু লোমের দিকে নজর দিলেও হবে না। খাবার, পানি, ত্বক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দিতে হবে।
অর্থাৎ, ভালো যত্ন মানে বিড়ালের পুরো শরীর ও দৈনন্দিন জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া।
শেষ কথা
বিড়ালের লোম পড়া পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ লোম ঝরা তার স্বাভাবিক বিষয়। তবে সঠিক যত্ন নিলে অতিরিক্ত লোম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
নিয়মিত ব্রাশ করুন। ভালো খাবার দিন। পর্যাপ্ত পানি রাখুন। পাশাপাশি ফ্লি থেকে বিড়ালকে সুরক্ষিত রাখুন।
এছাড়া তার থাকার জায়গা পরিষ্কার রাখুন। প্রতিদিন খেলাধুলার সুযোগ দিন। বিড়ালের দুশ্চিন্তাও কমানোর চেষ্টা করুন।
সবশেষে, হঠাৎ করে লোম পড়া বেড়ে গেলে অবহেলা করবেন না। ত্বকে ক্ষত, চুলকানি বা টাকের দাগ দেখা দিলে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ভালোবাসা ও নিয়মিত যত্ন পেলে বিড়াল সুস্থ থাকবে। তার লোমও সুন্দর ও নরম থাকবে। একই সঙ্গে ঘরেও অতিরিক্ত লোমের ঝামেলা অনেকটাই