Bird Care

বাজিগার পাখির ডিম ফুটতে কত দিন লাগে? সম্পূর্ণ গাইড

বাজিগার পাখির ডিমে তা দেওয়া

বাজিগার পাখির ডিম ফুটতে সাধারণত ১৭ থেকে ২১ দিন সময় লাগে। তবে সব ডিম একই সময়ে ফুটবে না। কারণ স্ত্রী পাখি সাধারণত একদিন পরপর বা কাছাকাছি সময়ে ডিম পাড়ে। তাই প্রতিটি ডিমের বয়স আলাদা হতে পারে। এছাড়া পাখির স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং নিয়মিত তা দেওয়ার ওপরও সময় কিছুটা নির্ভর করে। সুতরাং,বাজিগার পাখির ডিম ফুটতে কয়েক দিন কমবেশি হলে চিন্তার কারণ নেই।

এই গাইডে ডিম পাড়া থেকে শুরু করে বাচ্চা বের হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজভাবে জানানো হবে। এছাড়া, ডিমের যত্ন এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতাও জানতে পারবেন।

বাজিগার পাখির ডিম ফুটতে কত দিন লাগে?

সাধারণভাবে বাজিগারের একটি ডিম ফুটতে ১৭ থেকে ২১ দিন সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে ১৮ দিনের কাছাকাছি বাচ্চা বের হতে দেখা যায়। তবে প্রথম ডিম এবং পরের ডিমগুলোর মধ্যে কয়েক দিনের ব্যবধান থাকতে পারে।

একটি স্ত্রী বাজিগার সাধারণত একসঙ্গে সব ডিম পাড়ে না। সাধারণত, সে একদিন পরপর একটি করে ডিম দিতে পারে। তাই সব ডিম একই দিনে ফুটবে—এমনটা আশা করা ঠিক নয়।

উদাহরণস্বরূপ, প্রথম ডিম যদি আগে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি আগে ফুটতে পারে। এরপর দ্বিতীয় বা তৃতীয় ডিম থেকে ধীরে ধীরে অন্য ছানাগুলো বের হবে। সুতরাং প্রতিটি ডিমের বয়স আলাদাভাবে বিবেচনা করা ভালো।

বাজিগার সাধারণত কতটি ডিম দেয়?

একটি স্ত্রী বাজিগার সাধারণত প্রায় ৪ থেকে ৮টি ডিম দিতে পারে। তবে সংখ্যা সবসময় একই থাকে না। কোনো পাখি কম ডিম দিতে পারে, আবার কোনোটি তুলনামূলক বেশি দিতে পারে।

পাখির বয়স, স্বাস্থ্য, খাবার এবং পরিবেশের ওপর ডিমের সংখ্যা নির্ভর করতে পারে। এছাড়া প্রথমবার ডিম দেওয়া পাখির ক্ষেত্রে সংখ্যা কিছুটা কম হওয়াও স্বাভাবিক।

তবে শুধু ডিমের সংখ্যা দেখেই পাখির স্বাস্থ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বরং মা পাখি সক্রিয় আছে কি না, খাবার খাচ্ছে কি না এবং স্বাভাবিক আচরণ করছে কি না—এসব বিষয়ও লক্ষ্য করা জরুরি।

ডিম দেওয়ার পর মা পাখি কী করে?

ডিম দেওয়ার পর স্ত্রী বাজিগার সাধারণত বাসার ভেতরে বেশি সময় কাটায়। সে ডিমের ওপর বসে তা দেয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অবস্থান পরিবর্তন করে।

পুরুষ পাখিটিও এই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ক্ষেত্রে সে স্ত্রী পাখিকে খাবার খাওয়ায়। ফলে স্ত্রীটি দীর্ঘ সময় বাসায় থাকার সুযোগ পায়।

তবে সব জোড়ার আচরণ একরকম নয়। তাই একটি নির্দিষ্ট নিয়ম সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

ডিমে তা দেওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ডিমের ভেতরের ভ্রূণের বিকাশের জন্য উষ্ণতা প্রয়োজন। মা পাখি ডিমের ওপর বসে এই উষ্ণতা বজায় রাখে। এছাড়া, সে মাঝে মাঝে ডিমের অবস্থান পরিবর্তন করে।

তাই এই সময়ে বাসাটি অযথা বিরক্ত করা উচিত নয়। বারবার নেস্ট বক্স খুললে মা পাখি ভয় পেতে পারে। ফলে, ডিমে তা দেওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমস্যা হতে পারে।

কোন দিনে ডিম ফুটতে পারে?

ডিম দেওয়ার পর সাধারণত ১৭ থেকে ২১ দিনের মধ্যে বাচ্চা বের হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে দিন গণনার ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ডিম পাড়ার দিন এবং নিয়মিত তা দেওয়ার সময় এক নয়।

কিছু ক্ষেত্রে মা পাখি প্রথম ডিম দেওয়ার পর থেকেই নিয়মিত তা দিতে শুরু করে। আবার কখনও দ্বিতীয় বা পরবর্তী ডিম দেওয়ার পর তা দেওয়ার সময় বেশি হতে পারে।

তাই শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখ দেখে নির্দিষ্ট দিন বলা কঠিন। তবে ১৭–২১ দিন একটি সাধারণ সময়সীমা হিসেবে ধরা যায়।

সব ডিম কি ফুটবে?

না, সব ডিম থেকে বাচ্চা বের হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

এর কয়েকটি কারণ থাকতে পারে:

  • ডিম নিষিক্ত না হওয়া
  • ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশ না হওয়া
  • তাপমাত্রার সমস্যা
  • দীর্ঘ সময় ডিমে তা না দেওয়া
  • মা পাখির অসুস্থতা
  • পুষ্টির ঘাটতি
  • ডিম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া

কখনও একটি ডিম থেকে ছানা বের হলেও অন্যটি থেকে নাও বের হতে পারে। এটি সবসময় অস্বাভাবিক নয়।

ডিম বা ছানার ক্ষেত্রে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে avian veterinarian-এর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

বাজিগার পাখির ডিমের যত্ন কীভাবে করবেন?

বাজিগারের ডিমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শান্ত এবং নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা।

১. বাসা পরিষ্কার ও নিরাপদ রাখুন

নেস্ট বক্স পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। তবে ডিমে তা দেওয়ার সময় ঘন ঘন বাসা পরিষ্কার করতে যাবেন না। এতে মা পাখি বিরক্ত হতে পারে।

অতিরিক্ত নোংরা হলে নিরাপদভাবে পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করতে হবে।

২. ডিম হাতে নেওয়া এড়িয়ে চলুন

ডিম দেখতে গিয়ে বারবার হাতে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ এতে ডিম পড়ে ভেঙে যেতে পারে এবং মা পাখিও অস্বস্তি বোধ করতে পারে।

তাই প্রয়োজন ছাড়া ডিম স্পর্শ না করাই নিরাপদ।

৩. খাবারের দিকে নজর দিন

ডিম দেওয়ার সময় স্ত্রী পাখির পুষ্টির প্রয়োজন বাড়তে পারে। তাই নিয়মিত মানসম্মত খাবার, পরিষ্কার পানি এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টির ব্যবস্থা রাখা উচিত।

বাজিগারের খাবারের তালিকায় ভালো মানের seed mix-এর পাশাপাশি উপযুক্ত শাকসবজি ও অন্যান্য নিরাপদ পুষ্টিকর খাবার রাখা যেতে পারে।

৪. পরিষ্কার পানি দিন

পাখির জন্য প্রতিদিন পরিষ্কার পানি রাখা জরুরি। পানির পাত্র নোংরা হয়ে গেলে দ্রুত পরিবর্তন করুন।

কারণ পরিষ্কার পানি না থাকলে পাখির স্বাভাবিক পানির চাহিদা পূরণে সমস্যা হতে পারে।

ডিম পরীক্ষা করা কি প্রয়োজন?

অনেক অভিজ্ঞ পাখিপালক ডিমের ভেতরে ভ্রূণ তৈরি হয়েছে কি না তা বোঝার জন্য candling পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এতে আলো ব্যবহার করে ডিমের ভেতরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

তবে নতুন পালনকারীদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ভুলভাবে ডিম ধরলে বা অতিরিক্ত নড়াচড়া করলে ক্ষতি হতে পারে।

সুতরাং অভিজ্ঞতা না থাকলে নিজে পরীক্ষা করার চেয়ে পাখিকে স্বাভাবিকভাবে তা দিতে দেওয়াই ভালো।

ডিম ফুটতে দেরি হলে কী করবেন?

ধরা যাক, একটি ডিম দেওয়ার পর ২১ দিন পার হয়ে গেছে, কিন্তু বাচ্চা বের হয়নি। তখনই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

কারণ ডিমে নিয়মিত তা দেওয়ার সময় এবং ডিম পাড়ার তারিখের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। এছাড়া প্রতিটি ডিমের বিকাশের গতি এক নয়।

তবে অনেক বেশি সময় পার হয়ে গেলে এবং ডিমে কোনো পরিবর্তন দেখা না গেলে অভিজ্ঞ avian veterinarian বা পাখির চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

নিজে থেকে ডিম ফাটানো বা বাচ্চাকে বের করার চেষ্টা করা উচিত নয়।

বাচ্চা বের হওয়ার আগে কী লক্ষণ দেখা যায়?

বাচ্চা বের হওয়ার কাছাকাছি সময়ে ডিমে ছোট ফাটল দেখা দিতে পারে। একে সাধারণভাবে pipping বলা হয়।

বাজিগার পাখির ডিম ফুটে বাচ্চা বের হচ্ছে
বাজিগার পাখির ডিম ফুটে ছোট বাচ্চা বের হওয়ার দৃশ্য।

বাজিগার পাখির ডিম

প্রথমে ছোট একটি ছিদ্র বা ফাটল দেখা যায়। এরপর ছানা ধীরে ধীরে খোলস ভাঙতে থাকে।

এই প্রক্রিয়াটি কয়েক ঘণ্টা সময় নিতে পারে। তাই প্রথম ফাটল দেখেই বাচ্চাকে সাহায্য করার চেষ্টা করবেন না। তাকে নিজের মতো করে খোলস থেকে বের হতে দিন।

এরপর, বাচ্চা বের হলে কিছু সময় তাকে বিরক্ত করবেন না। মা পাখি সাধারণত নিজের মতো করে ছানার যত্ন নেয়।

বাসার পরিবেশ শান্ত রাখুন এবং মা-বাবা পাখির জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও পানি নিশ্চিত করুন।

যদি মা পাখি ছানাকে খাবার না দেয়, ছানা দুর্বল হয়ে যায় অথবা কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, তাহলে দ্রুত পাখির চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বাজিগার পাখির ডিম ও ছানার জন্য পরিবেশ

প্রজননের সময় পাখির জন্য শান্ত পরিবেশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। খাঁচাটি এমন জায়গায় রাখুন যেখানে অতিরিক্ত শব্দ, মানুষের চলাচল বা অন্য প্রাণীর বিরক্তি কম।

খাঁচায় পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল থাকা দরকার, কিন্তু সরাসরি ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এড়িয়ে চলুন।

অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা পরিবেশও এড়িয়ে চলা ভালো। কারণ মা-বাবা পাখি এবং ছানা উভয়ের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ প্রয়োজন।

প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ছানাকে নিজেই বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।

বাচ্চা বের হওয়ার পর কী করবেন ?

বাচ্চা বের হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা তাকে বিরক্ত না করাই ভালো। কারণ, নবজাতক ছানা খুবই দুর্বল থাকে। মা পাখি সাধারণত তাকে উষ্ণ রাখে এবং খাবার দেয়।

এছাড়া, মা-বাবা পাখির জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও পরিষ্কার পানি রাখুন। বাসার পরিবেশও শান্ত রাখুন। তবে, মা পাখি ছানাকে খাবার না দিলে বা ছানা দুর্বল দেখালে দ্রুত পাখির চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কোন ভুলগুলো করা উচিত নয়?

ডিম ফুটানোর সময় নতুন পাখিপালকেরা কিছু সাধারণ ভুল করে থাকেন। যেমন—

  • বারবার নেস্ট বক্স খোলা
  • ডিম হাতে নিয়ে দেখা
  • ডিম নড়াচড়া করা
  • নিজে থেকে খোলস ভেঙে দেওয়া
  • হঠাৎ খাবার পরিবর্তন করা
  • পাখিকে ভয় দেখানো
  • অতিরিক্ত শব্দের পরিবেশে রাখা
  • পরিষ্কার পানি না দেওয়া
  • এসব কাজ এড়িয়ে চললে পাখির জন্য পরিস্থিতি অনেক বেশি স্বাভাবিক থাকে।
  • বাজিগারের ডিম ফুটতে কত দিন লাগে—সংক্ষেপে
  • সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো এক নজরে দেখে নেওয়া যাক:
  • ডিম ফুটতে সময়: প্রায় ১৭–২১ দিন
  • সাধারণ ডিমের সংখ্যা: প্রায় ৪–৮টি
  • ডিম পাড়ার ব্যবধান: সাধারণত একদিন পরপর বা কাছাকাছি ব্যবধানে
  • প্রথম ছানা: অনেক সময় প্রথম ডিমের পর প্রায় ১৭–২১ দিনের মধ্যে
  • যত্নের মূল বিষয়: শান্ত পরিবেশ, ভালো খাবার, পরিষ্কার পানি এবং কম বিরক্ত করা
  • তবে এগুলো গড় তথ্য। পাখির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ অনুযায়ী কিছুটা পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক

বাজিগার পাখির ডিম ফুটতে কত দিন লাগে—এর সহজ উত্তর হলো সাধারণত ১৭ থেকে ২১ দিন। তবে প্রতিটি ডিমের ক্ষেত্রে সময় একই নাও হতে পারে। কারণ ডিম পাড়ার সময়, তা দেওয়ার ধরন এবং পাখির স্বাস্থ্যের ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।

ডিম ফুটানোর সময় সবচেয়ে ভালো কাজ হলো পাখিকে শান্তিতে রাখা, পর্যাপ্ত খাবার ও পরিষ্কার পানি দেওয়া এবং অযথা বাসা না খোলা। এছাড়া কোনো ডিমে সমস্যা দেখা দিলে নিজের মতো করে ব্যবস্থা না নিয়ে অভিজ্ঞ পাখি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

সঠিক পরিবেশ এবং যত্ন পেলে বাজিগার দম্পতি স্বাভাবিকভাবেই তাদের ছানার যত্ন নিতে পারে। তাই ধৈর্য ধরুন, পাখির স্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করুন এবং প্রয়োজন ছাড়া হস্তক্ষেপ করবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *